ফুটবলে অফসাইড কি? কিভাবে হয় ও অফসাইডের নিয়ম জানুন

 ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। এই খেলায় গোল, পাস, ড্রিবলিং, ফাউল এবং পেনাল্টির পাশাপাশি অফসাইড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। প্রতিটি ফুটবল ম্যাচেই কমবেশি অফসাইডের ঘটনা দেখা যায়। তবে যারা নতুন ফুটবল দেখা শুরু করেছেন, তাঁদের অনেকেই অফসাইডের নিয়ম ঠিকভাবে বুঝতে পারেন না।

সহজভাবে বলতে গেলে, আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় সতীর্থের কাছ থেকে বল পাস পাওয়ার সময় প্রতিপক্ষের গোললাইনের খুব কাছে নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকলে এবং এরপর খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিলে অফসাইড হতে পারে।

তবে শুধু প্রতিপক্ষের গোলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেই অফসাইড হয় না। বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে খেলোয়াড়ের অবস্থান, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের অবস্থান এবং বলের সঙ্গে তার সম্পর্ক—সবকিছু বিবেচনা করা হয়।

এই আর্টিকেলে ফুটবলে অফসাইড কি, কখন অফসাইড হয়, অফসাইডের নিয়ম, কখন অফসাইড হয় না এবং অফসাইডের শাস্তি কী—এসব বিষয় সহজ উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।


ফুটবলে অফসাইড কি


ফুটবলে অফসাইড কি?

ফুটবল খেলায় আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় সতীর্থের কাছ থেকে বল পাস বা স্পর্শ করার মুহূর্তে প্রতিপক্ষের অর্ধে এমন অবস্থানে থাকেন, যেখানে তিনি বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকেন।

তবে শুধু অফসাইড অবস্থানে থাকাই অপরাধ নয়। ওই অবস্থান থেকে খেলোয়াড়কে বল নিয়ে খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে অথবা প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা সৃষ্টি করতে হবে। তখনই অফসাইড অপরাধ সংঘটিত হয়।

সহজ উদাহরণ:

ধরুন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে। ব্রাজিলের একজন খেলোয়াড় বল নিয়ে আক্রমণ করছেন। তাঁর একজন সতীর্থ বাংলাদেশের গোলপোস্টের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন।

এখন বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে ওই সতীর্থ যদি বল এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকেন এবং পাসটি গ্রহণ করে খেলায় অংশ নেন, তাহলে অফসাইড হতে পারে।

অর্থাৎ, সতীর্থ বল পাস দেওয়ার সময় খেলোয়াড়ের অবস্থানই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ফুটবলে অফসাইড কিভাবে হয়?

অফসাইড হওয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে তিনটি বিষয় মনে রাখতে হবে।

১. খেলোয়াড়কে প্রতিপক্ষের অর্ধে থাকতে হবে।

২. বল পাস বা স্পর্শ করার মুহূর্তে খেলোয়াড়কে বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকতে হবে।

৩. ওই অবস্থান থেকে খেলোয়াড়কে সক্রিয় খেলায় অংশ নিতে হবে।

চলুন, একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।

ধরুন, একটি দলের স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সতীর্থ মাঝমাঠ থেকে সামনে বল পাস দিলেন। পাস দেওয়ার মুহূর্তে স্ট্রাইকার যদি বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন।

এরপর তিনি যদি বলটি গ্রহণ করেন বা প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা সৃষ্টি করেন, তাহলে রেফারি অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

অফসাইড বোঝার জন্য দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড় কী?

অফসাইড নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়।

অনেকেই মনে করেন, গোলরক্ষকের সামনে থাকা শেষ ডিফেন্ডারকে অতিক্রম করলেই অফসাইড হয়। কিন্তু বিষয়টি আসলে এমন নয়।

IFAB-এর নিয়ম অনুযায়ী, অফসাইড নির্ধারণের সময় প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের অবস্থান বিবেচনা করা হয়। গোলরক্ষকও একজন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য হন।

সাধারণত গোলরক্ষক সবার পেছনে থাকেন। সে ক্ষেত্রে গোলরক্ষকের সামনে থাকা শেষ ডিফেন্ডারই দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় হন।

তবে গোলরক্ষক যদি সামনে চলে আসেন, তাহলে দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড় অন্য কেউ হতে পারেন।

উদাহরণ: গোলরক্ষক যদি নিজের পেনাল্টি এলাকার বাইরে চলে আসেন এবং তাঁর পেছনে মাত্র একজন ডিফেন্ডার থাকেন, তাহলে অফসাইড নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওই ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষকের অবস্থান বিবেচনা করতে হবে।

ফুটবলে অফসাইডের নিয়ম কী?

আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী অফসাইডের বিষয়টি IFAB-এর Law 11-এ উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

১. খেলোয়াড়কে প্রতিপক্ষের অর্ধে থাকতে হবে

কোনো খেলোয়াড় নিজের অর্ধে অবস্থান করলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন না।

এমনকি নিজের অর্ধে থাকা অবস্থায় সতীর্থের কাছ থেকে বল পেয়ে সরাসরি প্রতিপক্ষের গোলের দিকে দৌড়ালেও অফসাইড হবে না।

মনে রাখবেন, মাঝমাঠের লাইন বা হাফওয়ে লাইন প্রতিপক্ষের অর্ধের অংশ নয়। তাই খেলোয়াড়ের শরীরের কোনো অংশ প্রতিপক্ষের অর্ধে না থাকলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন না।

২. বল এবং দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের চেয়ে সামনে থাকতে হবে

বল পাস করার মুহূর্তে আক্রমণকারী খেলোয়াড়ের মাথা, শরীর বা পায়ের কোনো অংশ যদি বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকে, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন।

তবে প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে একই লাইনে থাকলে অফসাইড হবে না।

৩. হাত ও বাহু অফসাইড নির্ধারণে গণনা করা হয় না

অফসাইড নির্ধারণের সময় খেলোয়াড়ের মাথা, শরীর এবং পায়ের অবস্থান বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু হাত ও বাহু গণনা করা হয় না। গোলরক্ষকের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

এখানে কাঁধের নিচের বাহুর অংশ অফসাইড নির্ধারণে বিবেচিত হয় না। শরীরের যে অংশ দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী বৈধভাবে গোল করা যায়, সেই অংশগুলোর অবস্থান বিবেচনা করা হয়।

৪. বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে অবস্থান নির্ধারণ করা হয়

অফসাইড নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো সতীর্থ যখন বলটি পাস বা স্পর্শ করেন, সেই মুহূর্ত।

ধরুন, একজন স্ট্রাইকার বল পাস দেওয়ার সময় অনসাইড অবস্থানে ছিলেন। এরপর তিনি সামনে দৌড়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অতিক্রম করে বল গ্রহণ করলেন।

এ ক্ষেত্রে শুধু সামনে চলে যাওয়ার কারণে অফসাইড হবে না। কারণ বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে তিনি অনসাইড অবস্থানে ছিলেন।

৫. অফসাইড অবস্থানে থাকলেই অপরাধ হয় না

এটি অফসাইডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলোর একটি।

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে থাকলেও যদি তিনি বল স্পর্শ না করেন, প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা না দেন এবং অফসাইড অবস্থান থেকে কোনো সুবিধা না নেন, তাহলে তাঁকে অফসাইড দেওয়া হবে না।

অর্থাৎ, অফসাইড অবস্থানে থাকা এবং অফসাইড অপরাধ করা এক বিষয় নয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে অফসাইড অপরাধ হয়?

IFAB-এর নিয়ম অনুযায়ী, অফসাইড অবস্থানে থাকা খেলোয়াড় তিনভাবে সক্রিয় খেলায় অংশ নিয়ে অফসাইড অপরাধ করতে পারেন।

১. সরাসরি বল খেলে বা স্পর্শ করে

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে থাকা অবস্থায় সতীর্থের পাস করা বল স্পর্শ করলে বা খেললে অফসাইড হতে পারে।

উদাহরণ: সতীর্থ বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে একজন স্ট্রাইকার অফসাইড অবস্থানে ছিলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে বলটি গ্রহণ করলেন। এটি অফসাইড অপরাধ।

২. প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা সৃষ্টি করলে

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে থেকে প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা সৃষ্টি করলেও অফসাইড হতে পারে।

যেমন:

  • গোলরক্ষকের বল দেখার পথে স্পষ্টভাবে বাধা সৃষ্টি করা।
  • প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সঙ্গে বলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।
  • কাছাকাছি থাকা বল খেলার চেষ্টা করে প্রতিপক্ষের খেলায় প্রভাব ফেলা।
  • এমন কোনো কাজ করা, যার ফলে প্রতিপক্ষের বল খেলার সক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রভাবিত হয়।

উদাহরণ: একজন আক্রমণকারী অফসাইড অবস্থানে দাঁড়িয়ে গোলরক্ষকের সামনে এমনভাবে অবস্থান করলেন যে গোলরক্ষক বল দেখতে পারছেন না। সতীর্থের শটের সময় ওই খেলোয়াড়ের কারণে গোলরক্ষকের বল দেখার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হলে অফসাইড হতে পারে।

৩. অফসাইড অবস্থান থেকে সুবিধা গ্রহণ করলে

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে থাকার সময় বল প্রতিপক্ষের কাছ থেকে রিবাউন্ড বা ডিফ্লেক্ট হয়ে তাঁর কাছে এলে এবং তিনি সেই বল খেলে সুবিধা নিলে অফসাইড হতে পারে।

যেমন:

  • বল গোলপোস্টে লেগে ফিরে এলে।
  • ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে।
  • কোনো প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের শরীরে লেগে দিক পরিবর্তন করলে।
  • প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক বা অন্য খেলোয়াড় গোল বাঁচানোর চেষ্টা করে বলটি ঠেকালে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আগে থেকে অফসাইড অবস্থানে থাকা খেলোয়াড় বল খেলে সুবিধা নিতে পারেন না।

কখন অফসাইড হয় না?

ফুটবল খেলায় অনেক পরিস্থিতিতে একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের খুব কাছে থাকলেও অফসাইড হয় না। নিচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।

১. নিজের অর্ধে থাকলে

কোনো খেলোয়াড় নিজের অর্ধে অবস্থান করলে অফসাইড হয় না।

এমনকি তিনি সতীর্থের কাছ থেকে বল পেয়ে সরাসরি প্রতিপক্ষের গোলের দিকে এগিয়ে গেলেও অফসাইড অপরাধ হবে না।

২. দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে একই লাইনে থাকলে

বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে আক্রমণকারী খেলোয়াড় যদি দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে একই লাইনে থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন না।

অর্থাৎ, একই লাইনে থাকা বৈধ।

৩. বলের সঙ্গে একই লাইনে থাকলে

আক্রমণকারী খেলোয়াড় যদি বলের সঙ্গে একই লাইনে বা বলের পেছনে থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন না।

৪. গোল কিক থেকে সরাসরি বল পেলে

কোনো খেলোয়াড় সরাসরি গোল কিক থেকে বল গ্রহণ করলে অফসাইড হয় না।

উদাহরণ: গোলরক্ষক গোল কিক নিলেন এবং বলটি প্রতিপক্ষের গোলের কাছাকাছি থাকা সতীর্থের কাছে পৌঁছাল। সতীর্থ অফসাইড অবস্থানে থাকলেও সরাসরি গোল কিক থেকে বল পাওয়ায় অফসাইড হবে না।

৫. থ্রো-ইন থেকে সরাসরি বল পেলে

থ্রো-ইন বা টাচলাইন থেকে বল ছুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরাসরি বল পেলে অফসাইড হয় না।

এটি ফুটবলের অফসাইড নিয়মের একটি বিশেষ ব্যতিক্রম।

৬. কর্নার কিক থেকে সরাসরি বল পেলে

কর্নার কিক থেকে সরাসরি বল গ্রহণ করলেও অফসাইড হয় না।

তবে কর্নার কিক নেওয়ার পর সতীর্থ বলটি আবার কর্নার নেওয়া খেলোয়াড়ের কাছে পাস করলে এবং তিনি তখন অফসাইড অবস্থানে থেকে খেলায় অংশ নিলে অফসাইড হতে পারে।

৭. প্রতিপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বল খেললে

কোনো প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় যদি বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে বলটি পাস, ক্লিয়ার বা অন্যভাবে খেলার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই বল অফসাইড অবস্থানে থাকা আক্রমণকারী খেলোয়াড়ের কাছে গেলেও সাধারণত অফসাইড হয় না।

তবে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় যদি গোল বাঁচানোর জন্য বলটি ঠেকান, অর্থাৎ Deliberate Save করেন, তাহলে এই ব্যতিক্রম প্রযোজ্য নয়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—প্রতিপক্ষের শরীরে বল লেগে দিক পরিবর্তন করা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বল লেগে যাওয়া মানেই ইচ্ছাকৃতভাবে বল খেলা নয়।

গোল কিক, কর্নার কিক ও থ্রো-ইনে অফসাইড হয় না কেন?

ফুটবলের নিয়মে তিনটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি বল গ্রহণ করলে অফসাইড অপরাধ হয় না।

১. গোল কিক (Goal Kick)

২. কর্নার কিক (Corner Kick)

৩. থ্রো-ইন (Throw-in)

এগুলোকে অফসাইডের বিশেষ ব্যতিক্রম বলা হয়।

তবে এই তিনটি পরিস্থিতিতে সরাসরি বল পাওয়ার পর খেলোয়াড় আবার সতীর্থের কাছ থেকে পাস পেলে নতুন করে অফসাইডের নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।

মনে রাখবেন, ফ্রি কিক এই তিনটি ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই ফ্রি কিক থেকে সরাসরি বল পেলে অফসাইড হতে পারে।

অফসাইড হলে কী শাস্তি হয়?

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অপরাধ করলে রেফারি খেলা বন্ধ করে দেন এবং প্রতিপক্ষ দলকে একটি ইনডাইরেক্ট ফ্রি কিক (Indirect Free Kick) প্রদান করেন।

যে স্থানে অফসাইড অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেখান থেকেই ফ্রি কিক নেওয়া হয়। এমনকি খেলোয়াড় পরে নিজের অর্ধে ফিরে এসে বল খেললেও অফসাইড অপরাধের স্থান অনুযায়ী ফ্রি কিক দেওয়া হয়।

অফসাইডের কারণে সাধারণত গোল বাতিল করা হয়, যদি গোল করার আগে অফসাইড অপরাধ ঘটে থাকে।

তবে মনে রাখতে হবে, শুধু অফসাইড অবস্থানে থাকার কারণে গোল বাতিল করা হয় না। খেলোয়াড়কে সক্রিয় খেলায় অংশ নিয়ে অফসাইড অপরাধ করতে হবে।

অফসাইড নির্ধারণ করেন কে?

ফুটবল ম্যাচে মূল রেফারি এবং সহকারী রেফারি অফসাইড নির্ধারণে ভূমিকা পালন করেন।

সাধারণত মাঠের পাশে টাচলাইনের কাছে থাকা সহকারী রেফারি আক্রমণকারী খেলোয়াড়দের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করেন।

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অপরাধ করলে সহকারী রেফারি পতাকা তুলে মূল রেফারিকে সংকেত দেন। এরপর মূল রেফারি খেলা বন্ধ করে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূল রেফারির।

VAR প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইড কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?

আধুনিক ফুটবলে অনেক বড় প্রতিযোগিতায় VAR (Video Assistant Referee) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কোনো গোলের আগে অফসাইড হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে VAR গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

VAR-এর মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বল পাসের মুহূর্তে খেলোয়াড়ের অবস্থান পরীক্ষা করা হয়।

এতে খুব সামান্য ব্যবধানে হওয়া অফসাইডও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

তবে সব ফুটবল ম্যাচে VAR থাকে না। কোন প্রতিযোগিতায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট আয়োজক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

অফসাইড নিয়ে কয়েকটি সহজ উদাহরণ

নিচের উদাহরণগুলো পড়লে অফসাইডের নিয়ম আরও সহজে বুঝতে পারবেন।

উদাহরণ ১:

একজন স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সতীর্থ বল পাস দিলেন। পাস দেওয়ার মুহূর্তে স্ট্রাইকার দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি ছিলেন এবং বল গ্রহণ করলেন। এটি অফসাইড হতে পারে।

উদাহরণ ২:

একজন খেলোয়াড় বল পাস দেওয়ার সময় ডিফেন্ডারের সঙ্গে একই লাইনে ছিলেন। এরপর তিনি দৌড়ে সামনে গিয়ে বল গ্রহণ করলেন। এখানে অফসাইড হবে না।

উদাহরণ ৩:

একজন খেলোয়াড় নিজের অর্ধে দাঁড়িয়ে আছেন। সতীর্থ লম্বা পাস দিলেন এবং তিনি দৌড়ে প্রতিপক্ষের গোলের দিকে চলে গেলেন। এখানে অফসাইড হবে না।

উদাহরণ ৪:

একজন খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। সতীর্থ বল পাস দিলেও তিনি বল স্পর্শ করলেন না এবং প্রতিপক্ষের খেলায় কোনো বাধাও সৃষ্টি করলেন না। অন্য একজন অনসাইড খেলোয়াড় বলটি গ্রহণ করলেন। প্রথম খেলোয়াড়ের কারণে অফসাইড হবে না।

উদাহরণ ৫:

একজন আক্রমণকারী অফসাইড অবস্থানে ছিলেন। সতীর্থের শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে এলো এবং তিনি বলটি জালে পাঠালেন। এটি অফসাইড অপরাধ হতে পারে।

উদাহরণ ৬:

একজন খেলোয়াড় সরাসরি থ্রো-ইন থেকে বল গ্রহণ করলেন। তিনি প্রতিপক্ষের গোলের কাছে থাকলেও অফসাইড হবে না।

FAQ: ফুটবলের অফসাইড নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ফুটবলে অফসাইড কি?

ফুটবলে অফসাইড হলো এমন একটি নিয়ম, যেখানে সতীর্থের কাছ থেকে বল পাস বা স্পর্শ করার মুহূর্তে আক্রমণকারী খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের অর্ধে বল এবং দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকেন এবং পরে সক্রিয় খেলায় অংশ নেন।

২. অফসাইড হলে কী হয়?

কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অপরাধ করলে রেফারি খেলা বন্ধ করে প্রতিপক্ষ দলকে ইনডাইরেক্ট ফ্রি কিক দেন।

৩. নিজের অর্ধে কি অফসাইড হয়?

না। কোনো খেলোয়াড় নিজের অর্ধে থাকলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকেন না।

৪. গোলরক্ষককে অতিক্রম করলে কি অফসাইড হয়?

শুধু গোলরক্ষককে অতিক্রম করলেই অফসাইড হয় না। অফসাইড নির্ধারণের সময় বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের অবস্থান বিবেচনা করা হয়।

৫. কর্নার কিক থেকে কি অফসাইড হয়?

না। কর্নার কিক থেকে সরাসরি বল গ্রহণ করলে অফসাইড হয় না। তবে কর্নার কিকের পর সতীর্থ আবার বল পাস করলে তখন সাধারণ অফসাইড নিয়ম প্রযোজ্য হয়।

৬. থ্রো-ইন থেকে কি অফসাইড হয়?

না। কোনো খেলোয়াড় সরাসরি থ্রো-ইন থেকে বল গ্রহণ করলে অফসাইড হয় না।

৭. গোল কিক থেকে কি অফসাইড হয়?

না। সরাসরি গোল কিক থেকে বল গ্রহণ করলে অফসাইড অপরাধ হয় না।

৮. ফ্রি কিক থেকে কি অফসাইড হয়?

হ্যাঁ। ফ্রি কিক থেকে সরাসরি বল গ্রহণের ক্ষেত্রেও অফসাইড হতে পারে। কারণ ফ্রি কিক অফসাইডের বিশেষ ব্যতিক্রম নয়।

৯. অফসাইড অবস্থানে থাকলেই কি ফাউল হয়?

না। অফসাইড অবস্থানে থাকা নিজে কোনো অপরাধ নয়। খেলোয়াড়কে সক্রিয় খেলায় অংশ নিতে হবে বা প্রতিপক্ষের খেলায় বাধা সৃষ্টি করতে হবে।

১০. অফসাইড নির্ধারণের সময় হাত কি গণনা করা হয়?

না। খেলোয়াড়ের হাত ও বাহু অফসাইড নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় না। মাথা, শরীর এবং পায়ের নির্দিষ্ট অংশ বিবেচনা করা হয়।

১১. একজন খেলোয়াড় বল পাস দেওয়ার পর সামনে চলে গেলে কি অফসাইড হয়?

না, যদি বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে তিনি অনসাইড অবস্থানে থাকেন। অফসাইড নির্ধারণ করা হয় সতীর্থের বল খেলার বা স্পর্শ করার মুহূর্তে।

১২. গোলপোস্টে বল লেগে ফিরে এলে অফসাইড হয় কি?

আগে থেকে অফসাইড অবস্থানে থাকা কোনো খেলোয়াড় গোলপোস্ট বা ক্রসবারে লেগে ফিরে আসা বল খেলে সুবিধা নিলে অফসাইড অপরাধ হতে পারে।

উপসংহার

ফুটবল খেলায় অফসাইড একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। প্রথমবার শুনলে বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হলেও মূল বিষয়টি খুব সহজ। সতীর্থ বল পাস দেওয়ার মুহূর্তে আক্রমণকারী খেলোয়াড়ের অবস্থান দেখতে হবে। তিনি যদি প্রতিপক্ষের অর্ধে বল এবং দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন। তবে সেই অবস্থান থেকে সক্রিয় খেলায় অংশ না নিলে অপরাধ হবে না।

এ ছাড়া গোল কিক, কর্নার কিক ও থ্রো-ইন থেকে সরাসরি বল গ্রহণ করলে অফসাইড হয় না—এই তিনটি ব্যতিক্রমও মনে রাখা জরুরি।

আশা করি, এই আর্টিকেলটি পড়ার পর ফুটবলে অফসাইড কি, কখন অফসাইড হয় এবং অফসাইডের নিয়ম সম্পর্কে আপনার ধারণা পরিষ্কার হয়েছে। ফুটবল খেলা দেখার সময় এখন থেকে অফসাইডের সিদ্ধান্তগুলো আরও সহজে বুঝতে পারবেন।

Share This Article On:

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url